শনিবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৪

জঙ্গী তৈরির কারখানা থেকে ফিরে

জঙ্গী তৈরির কারখানা থেকে ফিরে

-সঞ্জীব চৌধুরী

(দৈনিক আমারদেশ ২০০৮-০৪-২৬)

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার পর কউ কোন হিন্দুকে ফাঁসাতে চাইলে সবচেয়ে সহজ উপায় ছিল হিন্দুটির বিরুদ্ধেবেটা হিন্দুস্তানের এজেন্ট’ –এই অভিযোগ আনা কালের বিবর্তনে এই অস্ত্র এখন ভোতা হয়ে গেছে সাধারণভাবে আমেরিকার নউইয়র্ক- টুইন টাওয়ারে এবং ওয়াশিংটনের পেন্টাগন ভবনে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর, বিশেষভাবে বাংলাদেশে ২০০৫ সালে ৬৩টি জেলায় প্রায় একই সঙ্গে সিরিজ বোমা হামলার পর কোন মুসলমানকে ফাঁসানোর জন্য অনুরূপ একটি সহজ পথ খুলে গেছে


এখন কোন মুসলমানকে বেকায়দায় ফেলতে হলে তার নামের আগে জঙ্গী তকমা জুড়ে দিলেই হয়ে গেল; বাকি ঘটনা আপনা আপনাই একের পর এক ঘটতে থাকবে যে মুসলমানকে টার্গেট করা হয় তার মুখে দাড়ি আর মাথায় টুপি থাকলে কাজটা একেবারেজলবৎ তরলংহয়ে যায় কওমী মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য তো বটেই, ছাত্রদের জন্যও টুপি পরা এবং দাড়ি রাখা সুন্নত হিসাবে বাধ্যতামূলক হওয়ায় তাদের জঙ্গী হিসাবে চিহ্নিত করাও এরকম সহজ হয়ে দাড়িয়েছে


এদিকে আরো কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশের কিছু সংখ্যকমুক্তমনাসাংবাদিক, বুদ্ধিজীবি মানবাধিকার কর্মী শিখে ফেলেছেন যে, দাড়ি-টুপিওয়ালা মুসলমানদের কষে গালি দিতে পারলে বিদেশী শক্তিমানদের দরবারে সুগন্ধী তামাক দিয়ে সাজান কল্কী পাওয়া যায় ফলে বিরামহীন চিৎকারে দেশে-বিদেশে ঘোষণা করা হচ্ছেবাংলাদেশ ইসলামী জঙ্গী প্রজননের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এবং কওমী মাদ্রাসাগুলো হচ্ছে জঙ্গী তৈরীর কারখানা এই প্রচার মাঝে মাঝে ক্লান্তিজনিত কারণে স্তিমিত হয়, আবার নবোদ্যমে চাঙ্গা হয়ে ওঠে আলেম বলে পরিচিত কিছু মুসলমান নিজেকেমডারেট মুসলমানহিসেবে তুলে ধরার জন্য অথবা হালুয়া-রুটির ভাগ পাওয়ার জন্য অথবা নিছক শত্রুতা উদ্ধারের জন্য খেলায় জড়িয়ে পড়ায় ব্যাপরটি আরো জটিল হয়ে উঠেছে

পটভূমিতে গত ১৪ ১৫ই ফেব্রুয়ারী চট্টগ্রামের ফিটিকছড়ির নানুপুর জামিয়া ইসলামিয়া ওবায়দিয়া মাদ্রাসার সুবর্ণ্ জয়ন্তী উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত মাহফিলে আমি আমন্ত্রীত হই আমি সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে আমার ঘনিষ্ঠজনদের কেউ কেউ বিষন্ন পড়েছিল আমার নিরাপত্তার বিষয়টি ভেবে কারণ এক শ্রেনীর মিডিয়ার কল্যাণে নানুপুর মাদ্রাসারজঙ্গী খ্যাতিঢাকা পর্য্ন্ত বিস্তার লাভ করেছে ১৪ই ফেব্রুয়ারী গোধূলিলগ্নে নানুপুর পৌছে দেখি চারদিক লোকে লোকারণ্য তখনো দলে দলে মানুষ আসছে, অনেকে আবার ফিরে যাচ্ছে, মাদ্রাসা কমপ্লেক্সকে ঘিরে বিস্তীর্ণ্ এলাকায়এমলা বসেছে, সেখানে কেনা-বেচার ধুম মঞ্চে উপবিষ্ঠ বিভিন্ন স্থান থেকে এমনকি বিদেশ থেকেও আগত অতিথিরা তারা একের পর এক ধর্ম্ কথা বয়ান করছেন, শ্রোতারা শুনছেন নিবিষ্ট মনে, কোথাও কোন বিশৃংখলা নেই জঙ্গীপণার কোন চিহ্ন নেই


ভিড় ঠেলে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো জমরউদ্দীন হুজুরের খাস কামরায় সেখানে তাঁর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় তিনি এমন ভাবে আমাকে আপন করে নিলেন যেন কত দিনের চেনা স্বজন জমিরউদ্দীন হুজুর উচ্চ স্তরের আধ্যাত্মিক সাধক হিসাবে সর্ব মহলে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে মেনে চলার পাশাপাশি উদার কোমল আচরণের মধ্য দিয়ে তার মধ্যে এমন এক ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটেছে যা সচরাচর দেখা যায় না আমাকে একজন হিন্দু হিসেবে জেনে এবং আমার ধর্ম্ পালন পদ্ধতি যে তার থেকে আলাদা এটা মেনে নিয়েই সেদিন তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার প্রতি সংশয়হীন বিশ্বাস শর্ত্হীন আত্মসমর্প্নই হচ্ছে আমাদের অন্তরের মিলনের ভিত্তি তিনি আন্তরিকভাবে আমার কুশল সংবাদ নিলেন, মুখে হাত বুলিয়ে আমাকে দোয়া করলেন এবং আমার যেন কোন অসুবিধা না হয় তা দেখতে বললেন আমার উপস্থিতি সেখানে সেদিন সেখানে মোটামুটি আলোড়ন তুলেছিল অনেকেই আমার সঙ্গে দেখা করার এবং কথা বলার জন্য আগ্রহী ছিলেন এভাবে দফায় দফায় আলাপ করতে গিয়ে রাত ২টা বেজে গিয়েছিল


পর দিন ভোরে ব্যক্তিগত কাজে চট্টগ্রাম শহরে গিয়ে তন্ময়ের সঙ্গে দেখা সে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার শেষ বর্ষের ছাত্র এবং আমার দেশে-এর শিক্ষা পাতার কন্ট্রিবউটর আমাকে হাতের কাছে পেয়েও নানুপুর মাদ্রাসারজঙ্গীরাকেটে ফেলেনি দেখে সেও উৎসাহী হলো আমার সঙ্গে মাহফিলে যেতে সেদিন জুমার নামাজের পর মাহফিল শেষ হয় জুমার নামাজ আদায় কালে মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের আশেপাশের বিস্তির্ণ্ এলাকায় তিল ধারণের জায়গা ছিল না সেদিনই নানুপুর মাদ্রাসার আশেপাশে বেড়াতে গেছি মাদ্রাসার একেবারে লাগোয়া হচ্ছে একটি বৌদ্ধ বিহার এটা ফটিকছড়ি থানার সর্ব বৃহত বৌদ্ধ মন্দির দীর্ঘ অর্ধ্ শতাব্দীকাল ধরে মাদ্রাসা আর বৌদ্ধ বিহার পাশাপাশি অবস্থান করছে কখনো কোন রকম অশান্তি হয়নি বৌদ্ধ মন্দির ছাড়াও মাদ্রাসা সংলগ্ন গ্রামটি বৌদ্ধ প্রধান খানিকটা দূরে ছোট একটি হিন্দু পল্লী আছে সেখানকার বাসিন্দারা মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ তাদের কথা ফটিক ছড়ির বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম থাকলেও মাদ্রাসার কারণে নানুপুর অনেকটা সন্ত্রাস মুক্ত সেখানকার আন্ত-ধর্মীয় সম্প্রীতি আমাকে মুগ্ধ করেছে সেখানে সুবর্ণ্ জয়ন্তীর মাহফিল উপলক্ষে যে মেলা বসে তাতে বেশ কয়েকজন হিন্দু ব্যেদ্ধ দোকানির দেখা পেয়েছিলাম সবাই মিলে মিশে আছে, শান্তিতে আছে আমার মনে একটা প্রশ্ন খচ খচ করছিল, জঙ্গী তৈরীর কারখানা হিসেবে নিন্দিত এই কওমী মাদ্রাসার পরিবর্তে সেখানে যদি একটা আধুণিক কলেজ গড়ে উঠত তবে কি হিন্দু বৌদ্ধ পাড়ার বৌ-ঝিরা এখনকার মত নিরাপদ থাকতে পারত?



মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষার ব্যাবস্থা করে একটা শাখা খোলা হয়েছে মওলানা শিহাবউদ্দীন সে শাখাটির পরিচালক তাকে জঙ্গী সাজিয়ে যখনজঙ্গল থেকে আটক করারগল্প ফাঁদা হয় তখন বুঝতে কষ্ট হয় না যে, ষড়যন্ত্রের শিকড় কত গভীরে ঢুকে গেছে এসব ষড়যন্ত্রে আলেম নামধারী গুটি কয়েক লোক জড়িত থাকায় ধর্ম্ প্রাণ মুসলমানদের জন্য পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে এদের সঙ্গে আবার রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তিশালী অংশের মাখামাখির কথা শোনা যায়ইদানিং তাদের নতুন অস্ত্র হয়েছে মুফতি হান্নানের জবানবন্দি মুফতি হান্নান এখন জেলে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সন্ত্রাসী তৎপরতা ষড়যন্ত্রমূলক কাজকর্মে নেতৃত্ব দেয়ার জোরালো অভিযোগ আছে তার জবানবন্দি হিসাবে পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে যেসব কথা ছাপা হয়েছে সেগুলো একত্র করলে আকারে মহাভারতকেও হার মানাবেমুফতি হান্নানের জবানবন্দিতে নাম আছেএকথা বলে মাঝেমধ্যেইজঙ্গিধরা হচ্ছে এবং তাদের কাছ থেকেগুরুত্বপূণতথ্য পাওয়া যাচ্ছে এইজঙ্গী জঙ্গীখেলা কবে শেষ হবে জানি না তবে ধরণের খেলাকে যে আইনের শাসন বলা যায় না একথা বিলক্ষণ বুঝি

বৃহষ্পতিবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৩

জঙ্গীপনার পোস্টমর্টেমঃ কওমী মাদ্রাসা -সঞ্জী ব চৌ ধু রী


উপ-সম্পাদকীয়, দৈনিক আমারদেশ, ঢাকা, ০১-০৮-২০০৬ জঙ্গীপনার পোস্টমর্টেমঃ কওমী মাদ্রাসা 




আমাদের দেশে কওমী মাদ্রাসা নিয়ে নাক সটিকানো নতুন নয়  নতুন যা, তা হচ্ছে কওমী মাদ্রাসার বিরোধিতা ইদানীং প্রচন্ড তীব্রতা লাভ করছে  কওমী মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক  কওমী মাদ্রাসাগুলো ছাত্রদের কূপমন্ডুক ধর্মান্ধ বানিয়ে ফেলে, দেশে সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারের পেছনে রয়েছে কওমী মাদ্রাসা, কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা সমাজের বোঝা, ব্যাঙ্গের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কওমী মাদ্রাসাগুলো সমাজকে পেছনের দিকে টানছেএসব অভিযোগের সাথে যুক্ত হয়েছে জংগী কানেকশনের অভিযোগ

অভিযোগকারীদের মতে, কওমী মাদ্রাসাগুলো জংগী তৈরীর কারখানায় পরিণত হয়েছে জংগীপনার সাথে রয়েছে কওমী মাদ্রাসাগুলোর ঘনিস্ট সংযোগ একাত্তরে কওমী মাদ্রাসাগুলো ছিল রাজাকারদের ঘাটি এখন হয়েছে জংগীদের ঘাটি  

এসব  অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অভিযোগকারীদের দাবী, হয় মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধ করে দেয়া হোক, বা নিদেন পক্ষে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যাবস্থার খোল-নলচে পাল্টানো হোক   মিডিয়ায় অভিযোগকারীদের প্রায় নিয়মিত তর্জন-গর্জন দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না তারা জোরালো প্রচার চালিয়ে পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে  

অভিযোগগুলো গুরুতর এতসব সত্য হলে বৃটিশরা যেমন সিপাহী বিদ্রোহের পর তৎকালীন ভারতবর্ষের হাজার হাজার মাদ্রাসা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল, বাংলাদেশেও তেমন কিছু একটা করতে হয় 

তার আগে কওমী  মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ঠান্ডা মাথায় একটু খতিয়ে দেখলে মন্দ হয় না  কওমী মাদ্রাসাগুলোতে মূলত ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হয়    ধর্মচর্চা তথা ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান গ্রহন যদি কূপমন্ডুকতা হয় তাহলে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক ছাত্ররাকূপমন্ডুক কিন্তু জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন জানাচ্ছে, সারা দুনিয়ায় মানুষের মধ্যে ধর্মচর্চা বাড়ছে এর অর্থ হচ্ছে বর্তমান দুনিয়ায় গরিষ্ঠসংখক মানুষ কূপমন্ডুক হতে চাইছে  তাহলে তো কওমী মাদ্রাসাগুলো মানবজাতির সার্বিক মনমানসিকতার মূলধারাতেই আছে !  এতে দোষ হলো কোথায় ?

অতি অবশ্যই কওমী মাদ্রাসা হচ্ছে ফর দি মুসলিম, অব দি মুসলিম, বাই দি মুসলিম  ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোন কোন মাদ্রাসায় অমুসলিম ছাত্ররা প্রাথমিক শিক্ষা নেয়ার জন্য ভর্তি হলেও কথাটা সত্য কিন্তু ধর্মশিক্ষা আর ধর্মান্ধ বানানো তো এক কথা নয়  বিশেষ করে দুর্গাপুজার প্রাক্কালে বিভিন্ন স্থানে প্রতীমা ভাংচুরের যেসব ঘটনা ঘটে সে সবে কওমী মাদ্রাসার ছাত্র জড়িত নাকিআধুণিকস্কুল কলেজে পড়ুয়া ক্লিনসেভড  গুন্ডারা জড়িত থাকে তার খোঁজখবর করলে মাদ্রাসার ছাত্ররা কতটা ধর্মান্ধ তা বেরিয়ে আসবে অভিযোগকারীরা কিন্তু তথ্য আমাদের জানান না অনুরূপভাবে সাম্প্রদায়িকতার কু সিত খেলা গোটা উপমহাদেশে ইংরেজী শিক্ষিতআধুণিকলোকেরা শুরু করেছে এবং তারা নিজেদের স্বার্থে নানা কৌশলে এখনো খেলা খেলে যাচ্ছে  ইতিহাস সাক্ষী, ভারতীয় উপমহাদেশে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য মুসলমানদের আগমনের সময় থেকে বৃটিশ রাজত্ব কায়েমের আগে পর্যন্ত প্রায় এক হাজার বছরে অঞ্চলে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু একটাও সাম্প্রদায়িক দাংগা হয়নি অঞ্চলের সব ধর্মের মানুষ তখন এতটাইকূপমন্ডুকছিল যে সাম্প্রদায়িক দাংগা কাকে বলে তা তার বুঝতই না অথচ সে সময়ে মুসলমানদের শিক্ষার  একমাত্র উপায় ছিল মাদ্রাসা ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত আধুনিক হয়ে অঞ্চলের মানুষ বুঝতে শিখেছে যে, সাম্প্রদায়িক দাংগায় ধর্মের ইজ্জত বাড়ে, সে সঙ্গে অন্যান্য লাভেরও সম্ভাবনা থাকে

কওমী মাদ্রাসা নিয়ে কথা বলার সময় আমরা ভুলে যাই যে, এদেশে কয়েক ধরণের মাদ্রাসা আছে এগুলোকে মোটা দাগে দুভাগ করা হলেও তাতে চিত্রটা পরিষ্কার হয় না বৃটিশরা তাদের ক্ষমতা পোক্ত করার স্বার্থে সিপাহী বিদ্রোহের পর কলকাতায় আলীয়া মাদ্রাসা স্থাপন করে কালীন ভারতের বিভিন্ন শহরে সরকারীভাবে আলীয়া মাদ্রাসা গড়ে উঠতে থাকে বাংলাদেশ স্বাধীণ হওয়ার পর আমাদের ভাগেও বেশ কয়েকটি আলীয়া মাদ্রাসা পড়েছে এগুলো সরকারীভাবে পরিচালিত হয় ১৮৬৬ সালে ভারতের দেওবন্দে দারুল উলুম প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীণতা প্রত্যাশী আলেমদের উদ্যোগে  দারুল উলুমের বিকাশের মধ্য দিয়ে নতুন করে উপমহাদেশে কওমী মাদ্রাসা যুগের সূচনা ঘটে দেওবন্দের প্রেরণায় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেকগুলো (বর্তমান বাংলাদেশ সহ) কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয় এসব বনেদি মাদ্রাসাই আমাদের দেশে কওমী মাদ্রাসার স্টান্ডার্ড

এর পাশা পাশি বিশেষ করে বাংলাদেশ হওয়ার পর আসলেইব্যাংগের ছাতার মতোবেশ কিছু মাদ্রাসা গজিয়েছে  এগুলো দুধরনের  স্বাধীণতার পর আমাদের দেশে একটা নব্য ধণিক শ্রেণি গড়ে উঠেছে তাদের ধনাঢ্য হওয়ার পন্থা নিয়ে আমি বিতর্কে যেতে চাইনা নব্য ধণিদের মাঝে যারা মুসলমান তাদের অনেকে নিজ গ্রামে অন্তত একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে আভিজাত্য প্রমাণে উৎসুক হয়ে ওঠেন  তার কিন্তু মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেই খালাস এসব মাদ্রাসা চলল কী চলল না তা নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যাথা নেই এমনকি তারা নিজেদের সন্তানকেও এসব মাদ্রাসায় পড়ান না

আর এক ধরণের মাদ্রাসা আছে যেগুলোকে এনজিও মাদ্রাসা বলা যায় পশ্চিমা খৃষ্টান এনজিওগুলোর মতো মধ্যপ্রাচ্যেও কিছু এনজিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যারা ইসলামের নামে দান-খয়রাত করে এসব এনজিও থেকে তদবীর করে টাকা এনে অনেক নতুন মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে আমাদের দেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে কর্মরত এনজিওগুলো যেসব স্কুল খুলেছে সেগুলোর যে দশা, মধ্যপ্রাচ্যের টাকায় প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাগুলোর দশাও তার থেকে ভিন্ন নয়  কিন্তু এসবব্যাংগের ছাতারঅনিয়ম এবং অপকর্মের জন্য বনেদী কওমী মাদ্রাসাগুলোকে দায়ী করলে উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো হয়

বনেদী কওমী মাদ্রাসা সম্পর্কে সবার জানা উচিৎ, এসব মাদ্রাসায় ধর্ম শিক্ষার পাশা পাশি অন্য যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে শেখানো হয় তা হচ্ছে ভদ্রতা আর নম্রতা আজকের অবক্ষয়ের যুগেও কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের বখাটেপনার কোন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে পত্রিকা পড়ার মত বুদ্ধি হওয়ার সময় থেকে আজ পর্যন্ত আমি সংবাদপত্রে এমন একটা খবরও দেখিনি যে, কওমী মাদ্রাসার কোন ছাত্র অন্য ধর্মের কোন মেয়েকে নিয়ে ভেগেছে কওমী মাদ্রাসার চরম বিরোধিতা কারীরাও একথা স্বীকার করতে বাধ্য হবেন যে, এই মাদ্রাসাগুলো অত্যন্ত শৃংখলার সংগে  পরিচালিত হয় মাদ্রাসা কতৃপক্ষ নিজেরা জঙ্গী না হলে এসব মাদ্রাসার কোন ছাত্রের পক্ষে জঙ্গী হয়ে ওঠা কঠিনই শুধু নয়, বরং অসম্ভব বনেদী কওমী মাদ্রাসাগুলোর অধ্যক্ষগণ প্রায় সবাই সমাজে অত্যন্ত সন্মানিত ব্যক্তি মুসলমানরা তো বটেই, এমনকি অন্য ধর্মের স্থানীয় লোকজনও তাঁদের শ্রদ্ধার চোখে দেখে  তারা যদি ধর্মের নামে জংগীপনার সাথে আসলেই জড়িয়ে পড়তেন তবে দেশ জুড়ে হৈ চৈ পড়ে যেত সেক্ষেত্রে জঙ্গী সংখ্যা কয়েক লাখে গিয়ে দাঁড়াতো 

কিন্তু ব্যাপক ধরপাকড়ের পর আমরা দেখছি, যেসব গুণ্ডার সর্দারকে মিডিয়া আদর করে গডফাদার অথবা টপটেরর নামে ডেকে থাকে তাদের অধীনেও জঙ্গিদের চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক গুণ্ডাপাণ্ডা আছে তাই কওমী মাদ্রাসার জঙ্গি কানেকশনের অভিযোগ হাস্যকর

কওমী মাদ্রাসাগুলোকে রাজাকারের ঘাঁটি আখ্যা দেয়া হাস্যকরই শুধু নয়, একই সঙ্গে বেদনাদায়ক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বনেদী কওমী মাদ্রাসাগুলো সব সময় ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনার লালন করে আসছে কারণে ব্রিটিশ আমলে মুসলিম লীগ সমর্থকরা কওমী মাদ্রাসাগুলোকে কংগ্রেসি মাদ্রাসা বলে ঠাট্টা করত পাকিস্তান হওয়ার পর জন্য কওমী মাদ্রাসাগুলোকে কম মূল্য দিতে হয়নি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো মন্তব্য না করেও কথা বলা যায়, জামায়াত যে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে সমর্থনের ভিত দৃঢ় করতে পারছে না, তার প্রধান কারণ কওমী মাদ্রাসাগুলোর  জামায়াত বিরোধিতা সর্বোপরি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের পুরোপুরি পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন সত্ত্বেও দাড়ি-টুপিঅলা রাজাকারদের চেয়ে দাড়ি কামানো রাজাকারের সংখ্যা যে অনেক বেশি ছিল ইতিহাস সে কথাই বলে

চুরি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণের মতো অপরাধের ঘটনায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েরআধুনিকছাত্ররা হরহামেশা ধরা পড়ছে বিদেশে লেখাপড়া শিখেমানুষহয়েছে এমন ছাত্ররাও বাদ পড়ছে না কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের কিন্তু এসব অপকর্মে জড়াতে দেখা যায় না

আসলে মাদ্রাসা শিক্ষা নিষিদ্ধ করার কথা যারা বলে, তারা গোটা বিষয়টি ঠিকমত তলিয়ে দেখে কিনা আমার অন্তত সন্দেহ আছে মাদ্রাসা ঘরানার শিক্ষার প্রবর্তন আর ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয় প্রায় সমসাময়িক ঘটনা মাদ্রাসায় শিক্ষিত মুসলমানরাই মুসলিম সাম্রাজ্যের হাল ধরেছেন ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন দেশে মুহম্মদ ঘোরির দিল্লী বিজয়ের পর থেকে ভারতে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার ঘটতে থাকে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ১৬০১ সালে ইংরেজ বণিকরা প্রথম যখন ভারতে পা রাখে, তখন শুধু দিল্লী-তে মাদ্রাসা ছিল হাজারের মতো ইংরেজরা ভারত দখল করার পর কিন্তু দৃশ্যপট পাল্টে যায় আমরা সবাই জানি, ব্রিটিশদের তাড়িয়ে ভারত স্বাধীন করার প্রথম সংগ্রাম হয়েছিল ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশরা এই স্বাধীনতা সংগ্রামের নাম দিয়েছে সিপাহী বিদ্রোহ আমরা ব্রিটিশদের শেখানোআধুনিকবিদ্যায় সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাস পড়ি ফলে অনেক কথা অজানা রয়ে গেছে ১৮৫৬ সালে দিল্লী-তে আলেমদের এক মহাসম্মেলনে ব্রিটিশবিরোধী লড়াই শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এক বছর পর শুরু হওয়া সে যুদ্ধে বাহাদুর শাহ জাফরকে প্রধান নেতা ঘোষণার সিদ্ধান্তও আলেমরাই নিয়েছিলেন সিপাহী বিদ্রোহে ব্রিটিশ বাহিনীর দেশীয় সৈন্যরা ছাড়াও হাজার হাজার আলেম অস্ত্র হাতে অংশ নিয়েছিলেন সিপাহী বিদ্রোহ শেষ হওয়ার পর ব্রিটিশরা সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, মুসলমানদের ধর্মীয় প্রেরণাই এই বিদ্রোহের জন্য প্রধানত দায়ী এর ফলে মুসলমানদের ওপর ভয়ঙ্কর নির্যাতন নেমে এসেছিল ইংরেজ ইতিহাসবিদ টমসন লিখেছেন : ইংরেজরা মুসলমানদের ধর্মীয় চেতনা নস্যাৎ করার জন্য ১৮৬১ সালে কোরআন শরীফের লাখ কপি পুড়িয়ে ফেলে ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৭ সালের মধ্যে বছরে ১৪ হাজার আলেমকে ফাঁসি দিয়ে, গুলি করে এবং আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় গোটা ভারতবর্ষে যতগুলো মাদ্রাসা ছিল, তার প্রায় সবগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়

এই চরম সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে মাওলানা কাসিম নানুতবী প্রত্যন্ত গ্রাম দেওবন্দে দারুল উলুম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন একটা ডালিম গাছের নিচে ৩০ মে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুমের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন মাওলানা মো. মাহমুদুল হাসান প্রথম ছাত্রের নামও ছিল মাহমুদুল হাসান এই ছাত্রই ভারতের প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী শায়খুল হিন্দ

দেওবন্দে দারুল উলুম প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মৃতপ্রায় মুসলিম সমাজে যে নবজীবনের সঞ্চার ঘটে, তারই পরম্পরায় গড়ে ওঠে কওমী মাদ্রাসাগুলো অসাম্প্রদায়িক দেশাত্মবোধের চেতনায় মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করা, প্রতিবেশী সমাজের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলা ছিল এর উদ্দেশ্য শায়খুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান, শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী প্রমুখ মহামনীষীদের নিরলস চেষ্টায় এই উদ্দেশ্য সার্থকতায় ভরে উঠেছিল দেওবন্দে দারুল উলুম প্রতিষ্ঠিত না হলে উপমহাদেশে মুসলমানদের অবস্থা স্পেনের মতো হতো কিনা জানি না, তবে মুসলমানদের অস্তিত্ব যে হারিকেন দিয়ে খুঁজতে হতো, কথা নির্দ্দিধায় বলা যায় এই ঘরানায় গড়ে ওঠা কওমী মাদ্রাসাগুলো সেই অগ্রসর ধর্মীয় চেতনার প্রতীক পুড়িয়ে ফেলা লাখ কপি কোরআন শরীফের ছাই আর ১৪ হাজার অকুতোভয় আলেমের বুকের রক্ত যে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষা ঘরানার ভিত রচনা করেছে, কতিপয় অর্বাচীন আজ তার মধ্যে পশ্চাৎপদতা আর জঙ্গিপনার জীবাণু খুঁজে বেড়ায় ব্রিটিশদের প্রেতাত্মার আছর থেকে জাতি কবে মুক্ত হবে জানি না